Home > জাতীয় > নিখোঁজ ৮ জনের সন্ধান মেলেনি

নিখোঁজ ৮ জনের সন্ধান মেলেনি

তিন দিন পার হলেও গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ‘নিখোঁজ’ নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোবাশ্বার হাসানের খোঁজ মেলেনি। গত মঙ্গলবার খিলগাঁওয়ের বাসার বাইরে যাওয়ার পর থেকে তার আর সন্ধান মিলছে না। এর আগে সাংবাদিক উৎপল দাস গত ১০ অক্টোবর নিখোঁজ হন। এক মাস পার হলেও তার ব্যাপারে কোনো তথ্য দিতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শুধু শিক্ষক মোবাশ্বার বা সাংবাদিক উৎপল নন, গত আড়াই মাসে রাজধানী

ও আশপাশের এলাকা থেকে রাজনৈতিক নেতা, ছাত্র, শিক্ষক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ীসহ ১০ জন রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়েছেন। এসব ঘটনার একটিতে অপহরণ মামলা ও অন্য ঘটনায় সংশ্নিষ্ট থানায় জিডি হলেও তদন্তে অগ্রগতি নেই। রহস্যজনক নিখোঁজ এসব ব্যক্তি কি অপহৃত হয়েছেন, নাকি তাদের কেউ ধরে নিয়ে গেছে, সে ব্যাপারে কেউ মুখ খুলছেন না। কার্যত এসব ঘটনা তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতিও নেই। এমন পরিস্থিতিতে স্বজনদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, একটি সভ্য রাষ্ট্রে এ ধরনের অবস্থা চলতে পারে না। যে কোনো নাগরিকের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কোনো ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন কারও কাম্য নয়। যদি অপরাধী কাউকেও ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তাকেও খুঁজে বের করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

ঢাকা মহানগর পুলিশের ডিসি মিডিয়া মাসুদুর রহমান বলেন, প্রত্যেকটি ঘটনা ভিন্ন ভিন্ন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে পাওয়ার জন্য সব ধরনের প্রচেষ্টা পুলিশ চালাচ্ছে।

র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, যে কোনো নিখোঁজের ঘটনা জানার পরপরই অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত হয়। অনেক সময় অন্যকে ফাঁসাতে কেউ কেউ আত্মগোপনে থাকে। আবার পাওনাদারকে টাকা দিতে ব্যর্থ হয়েও কেউ গা-ঢাকা দেয়।

খিলগাঁও থানার ওসি মশিউর রহমান বলেন, গত মঙ্গলবার খিলগাঁও এলাকা থেকে আপন দুই ভাই প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান ও ফয়সাল রহমান নিখোঁজ হওয়ার পর জিডি হয়। আসাদুজ্জামান মোবাইল ফোন সেট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। পরে জানা যায়, ওই দুই ভাইকের্ যাব আটক করেছিল। তাদের মধ্যে একজনের জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততা পেয়ে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। অন্যজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বারের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্য সংস্থাগুলোও চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

গতকাল দুপুরে ওই শিক্ষকের বনশ্রীর বাসায় গেলে তার বোন তামান্না তাসমীম জানান, তার ভাই মঙ্গলবার কর্মস্থলে যেতে বাসা থেকে বের হন। দিনভর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন। বিকেলে আগারগাঁও যান। সেখানে সর্বশেষ ফোনে কথা হয়। এরপর এমন একজন মানুষ নিখোঁজ হয়ে গেলেন! মোবাশ্বারের জন্য পুরো পরিবারই উৎকণ্ঠায় রয়েছে। মোবাশ্বার শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পেও কাজ করেন।

অন্য এক স্বজন জানান, গতকাল মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ে মোবাশ্বারের বাবা ও মাকে ডেকে নিয়ে কথা বলেছেন গোয়েন্দারা। তারা বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। পাশাপাশি তাকে উদ্ধারে চেষ্টার কথাও জানিয়েছেন।

এদিকে গতকাল নিখোঁজ শিক্ষকের বাবা মোতাহার হোসেন এক লিখিত বিবৃতিতে বলেছেন, ‘ছেলে নিখোঁজের পর তিনি থানায় জিডি করেছেন।র্ যাবকেও অবহিত করেছেন। ছেলেকে উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সার্বিক সহায়তা করছে। আশা করছি খুব দ্রুত ছেলেকে ফিরে পাবো।’

এদিকে নিখোঁজ উৎপলের বাবা চিত্তরঞ্জন দাস গতকাল জানান, এক মাস ধরে ছেলেটা নিখোঁজ। ওকে ফিরে পেতে নানা জায়গায় তিনি দৌড়াদৌড়ি করছেন। তার সাংবাদিক সহকর্মীরাও তৎপর। এর পরও ছেলেটার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।

পুলিশ ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২২ আগস্ট বিমানবন্দর সড়ক থেকে অপহৃত হন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও এবিএন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সাদাত আহমেদ (৪৫)। ওইদিন তাকে রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে নিজের গাড়ি থেকে অন্য একটি গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়। ওই ঘটনায় ক্যান্টনমেন্ট থানায় অপহরণের মামলা হলেও পুলিশ অপহৃত সাদাতকে উদ্ধার করতে পারেনি। কোনো অপহরণকারীকেও গ্রেফতার করা যায়নি।

ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মাহবুবুর রহমান বলেন, এখনও ওই ব্যবসায়ীর অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি। তার মোবাইল ফোন দুটি বন্ধ থাকায় প্রযুক্তিগত তদন্তও এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না।

ওসি বলেন, নিখোঁজ ব্যবসায়ীর বাবা থানায় মামলা করেছিলেন। তদন্ত করে দেখা গেছে ওই ব্যবসায়ীর পারিবারিক ঝামেলাও রয়েছে। এখন পরিবারের কেউ পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে না। তদন্তে কাঙ্ক্ষিত সহায়তাও করে না। এ থেকে পুলিশের সন্দেহ হচ্ছে, সাদাত কোথায় আছে, তা পরিবারের সদস্যরা জানেন।

২৬ আগস্ট গুলশানের ইউনিয়ন ব্যাংকের সামনে থেকে ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ কুমার রায়কে তুলে নেওয়া হয়। তিনি বেলারুশের অনারারি কনস্যুলার। এখনও সন্ধান মেলেনি তার।

গুলশান থানার ওসি আবু বকর সিদ্দিক জানান, ওই ব্যবসায়ীর কোনো সন্ধান মেলেনি। পুলিশ তার অবস্থান শনাক্তে চেষ্টা করছে।

২৬ আগস্ট রাজধানীর পল্টন থেকে নিখোঁজ হন কল্যাণ পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান। গত ২৭ অক্টোবর রাতে পুরান ঢাকার সূত্রাপুর থেকে একসঙ্গে নিখোঁজ হন বাংলাদেশ জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি মিঠুন চৌধুরী ও কেন্দ্রীয় নেতা আসিক ঘোষ।

গতকাল দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ওই দুই নেতার স্বজনরা জানান, এ বিষয়ে সূত্রাপুর থানায় জিডি করতে চাইলেও পুলিশ তা নিচ্ছে না। তারা কোথায় আছে, তাও বলছে না।

নিখোঁজ মিঠুন চৌধুরীর স্ত্রী সুমনা চৌধুরী সীমা বলেন, তারা উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন। তার স্বামী রাজনীতি করেন। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারে। কিন্তু আইন অনুযায়ী সে বিষয়ে তথ্য দিচ্ছে না। মিঠুন ও দলের নেতা আসিক ঘোষ কোথায় আছেন, তারা বেঁচে আছে কিনা, তা জানতে চাই।

২ সেপ্টেম্বর রাতে ধানমণ্ডির স্টার কাবাবের সামনে থেকে ইশরাক আহমেদ ফাহিম নামে এক ছাত্র নিখোঁজ হয়। ইশরাক কানাডার মনট্রিলের ম্যাগসাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। দেশে বেড়াতে এসে সে নিখোঁজ হলেও তার সন্ধান মেলেনি।

নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করুন- সুজন :নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বার হাসানসহ নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছে বেসরকারি সংস্থা সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক)। গতকাল এক বিবৃতিতে সংস্থাটির সভাপতি এম হাফিজউদ্দিন খান ও সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ আহ্বান জানান।

সিটিজিনিউজ২৪ডটকম/এডিটর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *