Home > অর্থনীতি > ঋণ আদায়ে এত অনিয়ম !

ঋণ আদায়ে এত অনিয়ম !

শহিদুল সোহাগ : আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বকেয়া ঋণের অর্থ আদায়ের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় অর্থ ঋণ আদালত। আইন অনুযায়ী আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ সংক্রান্ত মামলা এই আদালতেই দায়ের করতে হবে। অথচ ঋণের অর্থ আদায়ের জন্য প্রতিনিয়ত মামলা করা হচ্ছে ফৌজদারী আদালতে। ঋণের বিপরীতে ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে নেয়া চেক দিয়ে হচ্ছে এসব মামলা। ঋণ আদায়ের এই কৌশলকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে উচ্চ আদালত। এছাড়া ঋণের বিপরীতে চেক না নেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।

অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ৫(১) মতে, ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ আদায় সম্পর্কিত যাবতীয় মামলা ধারা ৪ এর অধীন প্রতিষ্ঠিত, ঘোষিত বা গণ্য হওয়া অর্থ ঋণ আদালতে দায়ের করতে হবে এবং উক্ত আদালতেই এসবের নিষ্পত্তি হবে।’

অথচ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থ ঋণ আদালতে মামলা না করে চেক প্রত্যাখ্যান সংক্রান্ত ‘এনআই অ্যাক্টে’ মামলা করে আসছে ফৌজদারী আদালতে। এছাড়া স্থাবর সম্পত্তি জামানত থাকা সত্ত্বেও সিকিউরিটি চেক নিয়ে এসব মামলা করা হচ্ছে। চট্টগ্রামের ফৌজদারী আদালতগুলোতে চেক প্রত্যাখ্যানের বিষয়ে মামলা দায়েরের হার মোট মামলার অর্ধেকেরও বেশী হবে বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত ২ নভেম্বর থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত নগরের ডবলমুরিং থানাধীন এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম শফি উদ্দিনের আদালতে ৪২টি মামলা হয়েছে; যার মধ্যে ৩৬টি এনআই অ্যাক্টের মামলা। গত ৯ নভেম্বর পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের বকেয়া ঋণের অর্থ আদায়ের জন্য পৃথক পাঁচটি মামলা করেছেন প্রিমিয়ার লিজিং এন্ড ফিন্যান্স লিমিটেডের অ্যাসিসটেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. শাহজাহান; চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম শফি উদ্দিনের আদালতে এসব মামলা করা হয়েছে সিকিউরিটি চেক ব্যবহার করে।

এদিকে গত ১২ নভেম্বর নগরের খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী ছগীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে ১ কোটি ৬৮ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৭৫ টাকার চেক প্রতারণার দুটি মামলা দায়ের হয়। চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম এসএম মাসুদ পারভেজের আদালতে মামলা দুটি করেন ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের পক্ষে সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার সাইফুল করিম। ব্যাংকের টাকা আদায়ের জন্য নিয়ম অনুযায়ী অর্থ ঋণ আইনে মামলা করেননি কেন- জানতে চাইলে ব্যাংক কর্মকর্তা সাইফুল করিম বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমি মামলার বাদি হয়েছি। এ বিষয়ে আমি বিস্তারিত বলতে পারছি না।’

গত ১৬ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ এক প্রজ্ঞাপনে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে, ভোক্তা ও ক্ষুদ্রঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলো ঋণগ্রহীতা থেকে আর তারিখবিহীন চেক নিতে পারবে না। একই সঙ্গে টাকার পরিমাণ উল্লেখ না করে ফাঁকা চেক নেওয়া যাবে না। এছাড়া ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে জামানত হিসেবে তারিখবিহীন খালি চেক ব্যাংকে রেখে পরবর্তী সময়ে ওই চেক প্রত্যাখ্যাত হওয়া আইনে মামলা করা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে গত ৪ এপ্রিল রুল জারি করে হাইকোর্ট।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থঋণ আদালত আইন অনুযায়ী বন্ধকি সম্পদ নিলামের বিধান রয়েছে। কিন্তু বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রি করা অতটা সহজ নয়। অনেক সময় দেখা যায়, বন্ধকি সম্পত্তি এক বা একাধিকবার অন্যের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তাদেরও যোগসাঁজশ থাকে। যার কারণে ঋণের বিপরীতে অগ্রিম তারিখযুক্ত বা তারিখবিহীন চেককে জামানত হিসেবে নেয়া হচ্ছে অনেক আগে থেকে। সময়মতো ঋণ পরিশোধ না করলে সেই চেক দিয়ে অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা হয়।

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের চট্টগ্রাম বিভাগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মামুনুল হক চৌধুরী বলেন, ‘অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে অপর্যাপ্ত সম্পদ জামানত নিয়ে ঋণ বিতরণ করে আসছেন অনেক ব্যাংক কর্মকর্তা। এসব সম্পদ নিলামে বিক্রি করে সুদ-আসল আদায় সম্ভব না হলে প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যায় পড়তে হয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। এমনকি এসব অনিয়ম দুদকের নজরেও আসতে পারে। সেজন্য একাধিক ফৌজদারী মামলা দিয়ে ঋণ গ্রহীতাদের উপর বে-আইনি চাপ সৃষ্টি করতে এসব মামলা করে আসছেন তারা। এক কথায় শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা।’

এদিকে চেক ফাঁকা থাকায় অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোও অসাধুতার আশ্রয় নিচ্ছে। অন্যদিকে গ্রাহকেরাও ব্যাংকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলছে। নগরীর এনায়েত বাজারস্থ ফেমাস সেনিটারীর মালিক ব্যবসায়ী মীর মঈনুল হাসান চৌধুরী আদালতে অভিযোগ করেন, জায়গা বন্ধক দিয়ে আল-আরাফা ইসলামী ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখা থেকে ৩৫ লাখ টাকার একটি ঋণ নেন তিনি। ঋণ নেয়ার সময় আটটি অলিখিত চেক দিয়েছেন তিনি। পরে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে সুদসহ ৩৬ লাখ ৫৮ হাজার টাকা দাবি করে ব্যাংক। পরে ব্যাংক কর্মকর্তারা ওই আটটি চেকের মধ্যে দুটি চেক ব্যবহার করে প্রত্যেক চেকে ৩৫ লাখ টাকা লিখে আদালতে চেক প্রত্যাখানের মামলা করে। একই সাথে ৭৭ লাখ ৩২ হাজার ১৩২ টাকা দাবি করে অর্থ ঋণ আদালতে আরও একটি মামলা করে। ওই মামলা তদন্ত করে পাঁচ ব্যাংক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পায় পিবিআই।

ব্যবসায়ী মীর মঈনুল হাসান চৌধুরী বলেন, ‘পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল। পরে তারা জামিন পেয়ে যায়। মামলাটি এখনো চলছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের নির্বাহী পরিচালক মো. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘ঋণের বিপরীতে অগ্রিম তারিখযুক্ত বা তারিখবিহীন চেককে জামানত হিসেবে গ্রহণের ফলে আইনি জটিলতা বাড়ছে। এ অবস্থায় প্রতি কিস্তির জন্য অগ্রিম তারিখসহ একটি করে চেক ও সুদসহ ঋণের সমপরিমাণ অর্থের জন্য তারিখবিহীন আরেকটি চেক নেওয়ার বিধান বাতিল করা হয়েছে। এখন কোন ব্যাংক যদি এক্ষেত্রে অনিয়ম করে তাহলে সংশ্লিষ্টরা আইনের আশ্রয় নিতে পারে।’

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবি সমিতির সভাপতি রতন কুমার রায় বলেন, ‘ঋণের বিপরীতে চেক জামানত রাখা আইনবহির্ভূত। বাংলাদেশ ব্যাংক এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। তবুও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চেক ব্যবহার করে মামলা করছে ফৌজদারী আদালতে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ আদায়ের মামলা এখতিয়ার সম্পন্ন আদালতে হওয়া উচিত।’

সিটিজিনিউজ২৪ডটকম/এডিটর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *