Home > জাতীয় > পৌষ এলো শীত কই

পৌষ এলো শীত কই

কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিশির বিন্দু আছে, আছে কুয়াশাও। কিন্তু নেই শীত। অথচ এর মধ্যেই এসেছে পৌষ। এই পরিস্থিতিতে আবহাওয়া ও পরিবেশবিদরা রীতিমতো উদ্বিগ্ন। শীত না আসার পেছনে খোঁজা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও।

ঢাকায় শেষ কনকনে শীতের দেখা মিলেছিল ২০১৩ সালে। ওই বছরের ৯ জানুয়ারি সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৭ দশমিক ২ ডিগ্রি। ওই শেষ। এর পর ঢাকায় আর ১০ ডিগ্রির নিচে নামেনি পারদ। গত বছরের ১৭ জানুয়ারি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ১২ দশমিক ৮ ডিগ্রি। ওটিই ছিল গত শীতে ঢাকার সবচেয়ে কম তাপমাত্রা। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা মাত্র তিন কি চার দিন ছিল ১৪ ডিগ্রির নিচে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বায়ুমণ্ডলের ‘জেড প্রবাহ’ দুর্বল থাকায় গত ক’বছর শীতের দেখা নেই।

ঘিয়ে রঙা পশমি যে চাদরটা উপহার পাওয়া হয়েছিল একদিন, তা এখনও গাঢ় ভাঁজে রাখা আছে কাঠের তাকে।

গলাবন্ধ সোয়েটারটায় মাঝেমধ্যে তাকানোই সার; ছোঁয়া হয় না ভুল করেও। হাত মোজা আর মাফলার হয়ে যাচ্ছে পৌরাণিক, কোনো এক জাদুঘরে স্টাডি ট্যুরে দেখবে স্কুলের বালক-বালিকারা। অবাক চোখ তাদের- এটা কী? সনাতন অ্যাপ্‌সের কী প্রাচীন এক গ্যাজেট! আর মায়েদের নিত্য হাহাকার- আহারে, সাধের হাতে বোনা উলের ব্লেজার পরানো হলো না এখনও ছেলেটাকে! মেয়েটার লাল গাউনটায় ফাংগাস জমছে ধীরে ধীরে।

আবহাওয়াবিদ শামীম হাসান ভূঁইয়া বলেন, ‘বৃষ্টির পরও বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ এখনও অনেক বেশি। এ কারণে শীত পড়তে পারছে না। উত্তরের বাতাস সক্রিয় হলে জলীয় বাষ্প শুষে নেবে। শীত বাড়বে। তবে-।’ একটু থামেন শামীম হাসান, ‘কনকনে শীত পড়ার তেমন সম্ভাবনা দেখছি না ঢাকায়। কারণ, ইট-পাথরের লাখো ভবন, গাড়ির ইঞ্জিনের নিত্যদিনের সৃষ্ট তাপ। ঢাকায় কৃত্রিম তাপাঞ্চল সৃষ্টি হয়েছে। অথচ ঢাকা থেকে মাত্র পাঁচ-ছয় কিলোমিটার দূরেও সন্ধ্যার পর ঠাণ্ডা বাড়ে।’ একটু আক্ষেপের স্বর তার গলায়- ‘শিশিরও নেই এ ঢাকা শহরে। কারণ কংক্রিট নির্মিত ভবনগুলো দিনের বেলায় সূর্যের তাপ শোষণ করে, নিঃসরণ করে রাতে।’

শীত না আসার অভিমানে আস্তে আস্তে মরে যাচ্ছে আমাদের খেজুর গাছগুলোও। পথের ধারে একলা পথিকের মতো রোগে ছাওয়া গাছগুলো যেন প্রতিনিয়ত বলে- একটু শীত দাও না প্লিজ, দুধেল গাইয়ের মতো একটু ঝরাই নিজেকে। তাই তো গাছ কাটার সেই হেঁসেটা আর নেই। নেই মাটির চৌকো পাতিল, বাঁশের ছোট্ট শলাকা বেয়ে রসের ধান্ধায় বসে থাকা কোনো শালিক কিংবা দোয়েল। আর গাছ কাটার গাছিরা সেই কবে পেশা বদলিয়ে এখন গার্মেন্টস কর্মী!

খুব করুণ একটা দৃশ্য বেরিয়ে আসবে একটা জরিপ করলে। একশ’ শিশুকে যদি একসঙ্গে দাঁড় করিয়ে বলা হয়- বলো তো, খেজুর রসের স্বাদ কী? সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করবে। তারপর কেউ একজন স্মার্ট স্বরে বলবে, ফান্টার মতো। তার দেখাদেখি আরেকজন বলবে, না, মিল্ক্কসেকের মতো। আমাদের বাচ্চারা এখন কোল্ড ড্রিংকস চেনে; খেজুরের রস চেনে না।

প্রবাদ আছে- গ্রীষ্ফ্মে বন্ধুরা বরফের মতো গলে যায়, শীতের বন্ধুরাই চিরকালের বন্ধু। জমাট বাঁধা, প্রগাঢ়। আর ব্রিটিশ কবি ও সামালোচক এডিথ সিটওয়েল বলেন, ‘শীত হলো স্বাচ্ছন্দ্য, উষ্ণতা আর ভালো খাবারের সময়। বন্ধুত্বপূর্ণ স্পর্শ পাওয়ার সময়। আগুনের পাশে বসে গল্প করার সময়। ঘরে ফেরার সময় এটাই।’

ঠিক তাই, শীত হলো ঘরে ফেরার সময়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে সময় ক্ষেপণের নয়; ঘরে ফিরে স্ত্রীর হাতের পিঠা খেতে খেতে সন্তান-সন্ততির সঙ্গে ভুলে যাওয়া রূপকথার গল্প বলার সময়- এক দেশে না এক রাজা ছিল…।

শীত নেই, সম্ভবত শীতের পিঠার কথা তাই ভুলে যাচ্ছি আমরা- দুধ পিঠা, রস পিঠা, ভাপা পিঠা, পুলি পিঠা, কাঁঠালি পিঠা, চিতই পিঠা, নারকেল পিঠার নাম। হরেক রকম পিঠা আছে, নানা রকম পিঠা… রাস্তায় পিঠা বিক্রেতারা এখন মোবাইলের ইয়ার ফোন বিক্রেতা।

তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। শামীম হাসান ভূঁইয়া বলেন, “অস্ট্রেলিয়ায় দাবদাহ সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। সেখানকার বাতাস তখন গরম হয়ে ওপরে উঠে যাবে। শূন্যস্থান পূরণ করবে সাইবেরিয়া থেকে হিমালয় ছুঁয়ে যাওয়া বাতাস। এ বাতাসকেই ‘জেড প্রবাহ’ বলে। অস্ট্রেলিয়ায় গরম যত বাড়বে, প্রবাহ তত শক্তিশালী হবে। শীতও এসে যাবে আমাদের দেশে।”

চলতি মাসের শুরুতে আবহাওয়া অফিসের মাসিক পূর্বাভাসে জানানো হয়েছিল, নিম্নচাপের কারণে মাসের প্রথমার্ধে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি থাকতে পারে। নিম্নচাপ কেটে গেলে শেষার্ধে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের কম থাকবে। এ সময় দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলে এক থেকে দুটি মৃদু (০৮-১০ ডিগ্রি সেললিয়াস) কিংবা মাঝারি (০৬-০৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। জানুয়ারিতে অর্থাৎ মাঘ মাসে একটি মৃদু থেকে মাঝারি ও একটি তীব্র (০৪-০৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) শৈত্যপ্রবাহ বইতে পারে উত্তর ও পূর্ববঙ্গে।

‘যদি শীতকাল না থাকত. তবে বসন্ত এত আনন্দদায়ক হতো না, জীবনকে চেনা যেত না নতুন রূপে।’ ব্রিটিশ-আমেরিকান লেখক অ্যানে ব্র্যাডস্ট্রিট হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘আহারে, সারাজীবনটা যদি শীতে ডুবে থাকা যেত!’ আমরা বলি, শীত হচ্ছে সবজি দিয়ে ধোঁয়া ওঠা গরম খিচুড়ির সময়। আর জাপানিরা বলে, ‘শীত হচ্ছে বিনয়ী কাল, কোটে হাত ঢুকিয়ে বিনয়ী হয়ে ওঠে মানুষ।’

ওহে শীত, এসো, কর্কটময় এই সময়ে বিনয়ী হয়ে উঠি আমরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *